সম্প্রতি মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগের কিছুদিন পূর্বে তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড-এর প্রায় ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এই তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর আলোকে গভীর আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আইনি কাঠামো ও অযোগ্যতার বিধান
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ধারা ৯(d) অনুযায়ী বলা হয়েছে—
“কোন ব্যক্তি যদি সরকার, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধে খেলাপি হন, তবে তিনি গভর্নর বা উপ-গভর্নরের পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না।”
এখানে ব্যবহৃত “has defaulted” শব্দগুচ্ছটি অতীতকাল নির্দেশ করে, অর্থাৎ কোনো সময়ে খেলাপি হওয়া ব্যক্তিও এই বিধানের আওতায় পড়তে পারেন।
সাধারণত ঋণ পুনঃতফসিল তখনই হয়, যখন ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন। অতএব, পুনঃতফসিলের ঘটনা নিজেই ইঙ্গিত করে যে ঋণটি কোনো না কোনো সময়ে খেলাপি ছিল।
Ultra Vires ও নিয়োগের বৈধতা
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করতে হবে। যদি নিয়োগটি আইনের স্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে, তবে সেটি Ultra Vires, অর্থাৎ ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হতে পারে।
যদি প্রমাণিত হয় যে গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি অতীতে ঋণ খেলাপি ছিলেন, তবে তাঁর নিয়োগ Void ab initio, অর্থাৎ শুরু থেকেই অবৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে।
স্বার্থের সংঘাত ও নৈতিক প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, পুনঃতফসিল নীতি, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের।
যদি এর প্রধান ব্যক্তি নিজেই একটি ব্যাংক থেকে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা গ্রহণ করেন, তবে তাঁর নিরপেক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এটি শুধু আইনি নয়, বরং নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও।
প্রস্তাবিত আইনি পর্যালোচনার বিষয়সমূহ
১. হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড-এর ঋণ কি পুনঃতফসিলের আগে খেলাপি ছিল?
২. সেই খেলাপি অবস্থা কি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের অযোগ্যতার বিধানের মধ্যে পড়ে?
৩. নিয়োগ দেওয়ার আগে সরকার কি এই বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করেছে?
উপসংহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে কঠোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের শাসন মানে শুধু আইন থাকা নয়; বরং সেই আইন বাস্তবে সমানভাবে প্রয়োগ হওয়া। যদি প্রমাণিত হয় যে আইনগত শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে, তাহলে সেই নিয়োগ আইনের চোখে টিকবে না।
এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং এটি একটি গঠনমূলক আইনি প্রশ্ন, যা উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার যোগ্য। দেশের যেকোনো নাগরিক এই প্রশ্ন উত্থাপন করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।